জানালার পাশে বসে কান্না করছে তিথি। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ভয়ের কিছু দেখেছে মেয়েটা। কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়ে ছিল তিথি। হঠাৎ এক দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে সে। স্বপ্নে যেটা দেখেছে, তা তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। যার কারণেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে মেয়েটা।
পুরো নাম তিথিয়া ইসলাম। বাবা আদর করে তিথি বলে ডাকতেন। বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র সন্তান তিথি। বয়স সবেমাত্র আঠারোতে পা দিয়েছে। তিথির ছোটবেলা কেটেছে যুগিয়া নামের ছোট্ট একটা শহরে। বাবা-মায়ের সাথেই থাকত সে। দোতলা বাসার নিচ তলায় দাদীর সাথে থাকত তিথিরা। তিথির দাদা মারা গেছেন বছর দুই-এক আগে। তিথি অনেক ভালো গান করত। তার স্কুলে গানের প্রতিযোগিতায় ৫ বার প্রথম স্থান অর্জন করেছিল সে। তার গান যে-ই শুনত, মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেই না কেন? তার মিষ্টি মধুর কন্ঠে গান শুনলে যে সবার প্রাণ জুড়িয়ে যেত। তিথির জন্মদিনে তার বাবা খুশি হয়ে তাকে একটা হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলেন।
তিথির বাবা রবিউল ইসলাম একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। বাসার পাশের একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করতেন। মাস শেষে যে অল্প টাকা পেতেন, তা দিয়েই সুন্দরভাবে চলত তাদের ছোট্ট সংসার। তিথির মা আফিয়া ইসলাম গৃহকর্তী ছিলেন। রান্না-বান্না ও মেয়ের দেখাশোনাই ছিল তার দৈনন্দিন কর্ম।
কিন্তু নির্মম ভাগ্যের পরিহাসে ৫ বছর আগে তিথির মা-বাবা মারা যান। তিথির চোখের সামনেই ঘটেছিল এই বেদনাদায়ক ঘটনা। সেই শোকের তীব্রতা এখনো কাটেনি তার মন থেকে।
তিথি যে দেশের নাগরিক, তার নাম বারখাদা। ছোট্ট দেশ হলেও জনসংখ্যা কম নয়। বারখাদাতে জনসংখ্যা ২২ কোটিরও বেশি। বেশিরভাগ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখানে ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবর্তে বিরাজ করে বিদ্বেষ ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা।
রাসুল (সাঃ) যে ঐক্যবদ্ধ জাতির কথা বলেছিলেন, বারখাদার মানুষ তা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে শৃঙ্খলার গুরুত্ব। এক নেতার আনুগত্যের কথাও তাদের কাছে অজানা। হাজার হাজার দলে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে কাফের ফতোয়া দেওয়াতেই ব্যস্ত তারা। মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়ে তুচ্ছ বিষয় নিয়েই শুরু করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এই সহিংসতায় কত নিরীহ মানুষই না প্রাণ হারায়! তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। তিথির পরিবারও এরই শিকার।
৭ জানুয়ারি ২০২১
দেশের সর্বত্র চলছে ভয়াবহ দাঙ্গা-হাঙ্গামা। লুটপাট, হানাহানি, রক্তপাতে ছেয়ে গেছে সারা দেশ। এই ঘটনার সূত্রপাত গতকাল রাতে একটি ওয়াজ মাহফিলে উস্কানিমূলক বক্তব্য থেকে। সেখানে ছোট্ট এক হাতাহাতির ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশজুড়ে। আজ সকাল থেকেই শুরু হয়েছে দু'পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
আজ তিথির ১৩তম জন্মদিন। এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করার জন্য সে তার নানা-নানির বাসায় যাচ্ছিল। বাসে যাত্রা করার কিছুক্ষণ পরই যানজটে আটকে পড়ে তাদের গাড়ি। তিথির জন্য খাবার কিনতে নামেন বাবা রবিউল ইসলাম।
দোকানে খাবার কিনতে কিনতে রবিউল সাহেব দেখতে পান, একটু দূরেই দু'দল কোনো বিষয় নিয়ে ঝামেলা শুরু করেছে। দূর থেকে তাদের পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা মাদ্রাসার ইমাম এবং তাদের ছাত্র। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকায় রবিউল সাহেব স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছেন দু'পক্ষের ইমাম একে অপরকে কাফের ফতোয়া দিচ্ছেন। হাতে চাপাতি, রামদা সহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে তারা ছাত্রদেরকে উত্তেজিত করছে।
এ ঘটনা দেখে রবিউল সাহেব দ্রুত বাসের দিকে এগিয়ে আসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি দুই দলের মাঝখানে আটকে পড়েন। চারপাশ থেকে তাকে আক্রমণ করা হয়। বাস থেকে আফিয়া ইসলাম এই ঘটনা দেখতে পান। তিনি তিথিকে বাসে বসে থাকতে বলে ছুটে আসেন রবিউল সাহেবের কাছে। দুই দলের মাঝে ঢুকে তিনি রবিউল সাহেবকে বাচাতে চান। কিন্তু ঢোকার পর তিনি রবিউল সাহেবকে নিয়ে বের হতে পারছিলেন না।
হঠাৎ করে তিনজন লোক তাদের দিকে ছুটে আসতে শুরু করে। তাদের সবার হাতে ছিলো অস্ত্র। তিথির বাবা-মা ভয়ে চিৎকার করে উঠে। তিনজনের একজন তার হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে সজরে আঘাত করে রবিউল সাহেবের ডান হাতের কনুই বরাবর। এক কোপেই তিথির বাবার হাতের অর্ধেকটা মাটিতে পরে যায়। রবিউল সাহেব ও তার স্ত্রী চিৎকার করে বলতে থাকেন, "আমরা কিছু করিনি, আমাদের ছেড়ে দিন!" কিন্তু সেই তিনজন তাদের কথা রাখে না। এবার পাশে থাকা আরেকজন ছেলে একটা কোপ বসিয়ে দেয় রবিউল সাহেবের পা বরাবর। রবিউল সাহেব আর দাঁড়াতে পারছেন না।
তিনি ক্লান্ত এবং আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন। রবিউল সাহেবের এমন অবস্থা দেখে আফিয়া ইসলাম পাশে থাকা একটা ইট নিয়ে ছুটে যান সেই তিনজন লোকের দিকে। কিন্তু তিনজনের চাপাতির সামনে টিকতে পারেন না তিনিও। তাকেও হারাতে হয় তার হাত। সেই তিনজন অনেক আনন্দ পাচ্ছিল। তারা হাসতে হাসতে বলতে লাগল, "জেহাদ করছি। আল্লাহ আমাদের জান্নাতুল ফেরদাউস দান করবেন। আলহামদুলিল্লাহ।"
তারা আর সময় নষ্ট না করে হাসতে হাসতে কোপ বসিয়ে দেয় রবিউল সাহেবের গলা বরাবর। এক মুহূর্তেই দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায় রবিউল সাহেবের মাথা। তারপর তারা ছুটে আসে তিথির মায়ের দিকে। তিথির মা চিৎকার করে বলতে থাকেন, "এ কেমন ইসলাম? কোনো নিষ্পাপ মানুষকে খুন করে জেহাদ বলে চালিয়ে দিচ্ছে? এই ইসলাম তো আল্লাহর রসুল অর্ধ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে কোথায় এই শিক্ষা পেলো মাদ্রাসার ছাত্ররা?"
তার বলার আরও অনেক কথা ছিল, কিন্তু আফিয়া ইসলাম তা শেষ করতে পারলেন না। কথা শেষ করার আগেই তার মাথাও শরীর থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। সেই তিনজন এবার তাদের শেষ কাজটি করার অপেক্ষায় রইল। পাশে থেকে একজন প্রেট্রল নিয়ে এসে তিথির বাবা-মায়ের শরীরের উপর ছিটিয়ে দিল। তারপর জ্বালিয়ে দিল আগুন। দাউ দাউ করে আগুন বাড়তে থাকল এবং রবিউল সাহেব ও আফিয়া ইসলামের দেহ দুটি পুড়তে থাকল।
বাস থেকে তিথি কান্নারত অবস্থায় সেই তিনজনের অট্টহাসি দেখছিল। বারবার তিথির মনে হচ্ছে, সে একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখছে যা ঘুম ভাঙলেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই দিনের ঘটনা কোনো দুঃস্বপ্ন ছিল না। দুই দলের লড়াইয়ের মাঝখানে পুলিশ এসে পড়লে দুই পক্ষের লোকজনই পালিয়ে যায়। পুরো রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। শুধু পড়ে থাকে কিছু মৃতদেহের সাথে তিথির বাবা-মায়ের মাথাবিহীন পোড়া দেহ দুটি। তিথি অনেক চেষ্টা করেছিল তার বাবা-মায়ের কাছে যেতে, কিন্তু পারেনি। বাসের যাত্রীরা তাকে যেতে দেয়নি।
ছেলে এবং ছেলের বউয়ের অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিথির দাদী রহিমা ইসলাম। রহিমা ইসলামের মেয়ে না থাকায় তিনি তার ছেলের বউকেই নিজের মেয়ের মতো দেখতেন। তাদের মৃত্যুর খবর শুনে আর নিজেকে সামলিয়ে রাখতে পারেননি তিনি। সেই রাতেই তিথির দাদীর হার্ট অ্যাটাক হয়। ভাটাটিয়ারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও আর কিছু করা সম্ভব হয় না। তিনিও তার দুই সন্তানের সাথে একই দিনে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
১৬ ডিসেম্বর ২০২৬
আজ তিথির স্কুলে বড় একটা অনুষ্ঠান। গানের প্রতিযোগিতাও রয়েছে। কিন্তু তিথির নাম নেই তালিকায়। থাকবেই বা কিভাবে? তিথি যে আর গান গাইতে পারে না। তার সেই মিষ্ট মধুর কন্ঠ কেউ আর শুনতে পারেনা। সেদিনের ঘটনা সরাসরি দেখে মেনে নিতে পারেনি মেয়েটা। প্রচণ্ড রকমের শক খেয়েছিলো তিথি। তারপর কিছুদিন জ্বরের ঘোরের ভিতরেই পরে থাকে মেয়েটা। তার এই জ্বরের মাত্রা এতই তীব্র ছিলো যে তার অনেক ইন্দ্রিয় নষ্ট হয়ে যায়। তারপর থেকেই মেয়েটা আর কথা বলতে পারে না।
তিথি এখন একা থাকতে ভালোবাসে। তার বেশিরভাগ সময় কেটে যায় অন্ধকার ঘরে।
সে এখন তার নানা-নানীর সাথে তাদের বাসায় থাকে। প্রতিদিন বাবা-মায়ের মৃত্যুর এই ঘটনা স্বপ্নে দেখে মেয়েটা। তারপর জানালার পাশে বসে তিথি অঝোরে কান্না করতে থাকে। মনে মনে চিৎকার করে প্রশ্ন করে, "এ কেমন সমাজ, আল্লাহ? আমাকে এ কেমন দুনিয়ায় পাঠালেন আপনি? আপনি তো বলেছেন, যারা আপনাকে অনুসরণ করবে তারা হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। তারা করবে না কোনো মারামারি, হানাহানি, রক্তপাত। তারা হবে ঐক্যবদ্ধ এবং শৃঙ্খলিত। তারা মানুষকে ভালোবাসবে। কিন্তু বর্তমান সমাজ তো এমন নয়, আল্লাহ! তাহলে কি আমরা আপনাকে অনুসরণ করছি না?"
এই প্রশ্ন করতে করতেই তিথি আল্লাহর কাছে চায় একটা শান্তির ঘুম। এই শান্তির ঘুমের অপেক্ষায় ক্লান্ত মেয়েটি জানালার পাশেই ঘুমিয়ে পড়ে প্রতিদিন।
অসমাপ্ত সুর_28-03-2024
আরাফাত হোসেন শিফাত